বরিশাল ও ভাসমান পেয়ারার হাট: খালের ওপর বর্ষার একটি সকাল
সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চ, কীর্তনখোলায় ভোর, তারপর ছোট নৌকায় ভীমরুলি আর আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারার নৌকায় ভরা খালে, আর বিকেলে দুর্গাসাগরের স্থির জলের ধারে।
৪ মিনিটে পড়া যাবে

লঞ্চ সদরঘাট ছাড়ে সন্ধ্যায়, আর ছাড়ার মুহূর্তটাই একটা দৃশ্য। বুড়িগঙ্গার পাড়ে পাশাপাশি গাদাগাদি বহুতল লঞ্চ, একে একে আলো জ্বলছে, কুলিরা মাথায় ব্যাগ-বাক্স নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছুটছেন, পানির ওপর দিয়ে গমগম করে বাজছে হর্ন। আপনি উঠে কেবিন বা ডেকে একটা জায়গা খুঁজে নেন, আর দেখেন পেছনে ঢাকা সরে যাচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গের প্রায় প্রতিটি পরিবারের কাছে এই রাতের যাত্রা এক সাধারণ স্মৃতি: কেবিন আর ভিড়ের ডেক, রেলিং ধরে এগিয়ে চলা চা-ওয়ালা, রাতের নদীর গন্ধ। যতক্ষণ জেগে থাকা যায়, বাইরে বসে থাকেন। নদী চওড়া হয়, পাড়ের আলো কমে আসে, পানির ওপর তারা ফোটে।
সড়কপথ পছন্দ হলে এখন বাস পদ্মা সেতু দিয়ে পদ্মা পেরিয়ে মোটামুটি চার-পাঁচ ঘণ্টায় বরিশাল পৌঁছায়, দিনের যেকোনো সময়। তবে লঞ্চই চিরচেনা পথ, আর এই যাত্রায় আপনি লঞ্চেই যাচ্ছেন।
কীর্তনখোলায় ভোর
ফ্যাকাশে আকাশ আর ধীর হয়ে আসা ইঞ্জিনের শব্দে ঘুম ভাঙে। লঞ্চ কীর্তনখোলার তীরে বরিশালের ঘাটে ভিড়ছে, নদীর পাড় তখনই নৌকা, রিকশা আর যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা মানুষে ব্যস্ত। ছোট নৌকায় মানুষ নদী পার হচ্ছে। এখানে জীবন চলে নদী আর জোয়ার-ভাটা মেনে, প্রথম মিনিট থেকেই তা টের পাওয়া যায়।
নদীর ধারে চা খেয়ে একটা সিএনজি নিয়ে পশ্চিমে রওনা দেন। বর্ষাকাল, জুলাইয়ের শেষ, আর আপনি যাচ্ছেন পেয়ারার দেশে।
খালের ভেতরে
পথ গেছে ঝালকাঠি, এক শান্ত নদীর শহর, যা একসময় পূর্ববঙ্গের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর একটি ছিল; সেখান থেকে ভীমরুলি গ্রামের দিকে। পথে পড়ে কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ির পুরোনো অট্টালিকা, খিলানওয়ালা বারান্দা জীর্ণ আর গাছপালায় সবুজ, নদীবাণিজ্য একসময় যে সম্পদ এনেছিল তার স্মারক।
তারপর মাটি বদলে যায়। লম্বা উঁচু কান্দি, প্রতিটিতে পেয়ারা আর আমড়ার গাছ, সরু নালার মাঝে মাঝে সমান্তরালে চলে গেছে। আড়াআড়ি কেটে গেছে খাল। সবকিছু সবুজ, ছায়াঢাকা আর ভেজা। ঝালকাঠি, পিরোজপুর আর বরিশালের এই কোণের বাগানের দৃশ্য এটাই, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই চলছে।
পানির ওপর হাট
কয়েকটি খালের মোহনায় ভীমরুলিতে পেয়ে যান সেটা: মৌসুম ঠিক থাকলে পানি ছোট ছোট নৌকায় ভরা, প্রতিটিতে ফিকে সবুজ পেয়ারার স্তূপ। আশপাশের বাগান থেকে কৃষকেরা বৈঠা বেয়ে এসেছেন, নৌকা থেকে নৌকায় বেচাকেনা চলছে পাইকারদের সঙ্গে, যাঁদের বড় নৌকা ফল নিয়ে যাবে বরিশাল, ঢাকা আর আরও দূরে। পানিতে কথার প্রতিধ্বনি। নৌকায় নৌকায় মৃদু ঠোকাঠুকি। কেউ টিনের কৌটায় বৃষ্টির পানি সেঁচছেন।
মৌসুম মোটামুটি জুলাই থেকে আগস্ট, কখনো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, আর হাট সবচেয়ে জমে সকালে; যত আগে পৌঁছাবেন, তত বেশি দেখবেন। মৌসুমের শেষ দিকে নৌকায় পেয়ারার সঙ্গে যোগ হয় আমড়া।
একটা ছোট ডিঙি ভাড়া করুন, মাঝিকে বলুন হাট ছেড়ে বাগানের সরু খালে নিয়ে যেতে। পানি কালো আর স্থির, দুই দিক থেকে পেয়ারাগাছ ঝুঁকে আছে, শব্দ বলতে শুধু বৈঠার ছলাৎ। মালিক রাজি থাকলে কোনো বাগানে নেমে কান্দির ওপর হাঁটুন। নৌকা থেকে সরাসরি কয়েকটা পেয়ারা কিনে স্থানীয় কায়দায় খান, লবণ-মরিচ দিয়ে।
বর্ষাকাল, তাই যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামতে পারে। ফোন আর ক্যামেরা ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে রাখুন, এমন স্যান্ডেল পরুন যা ভিজলে ক্ষতি নেই, আর ছোট নৌকায় নিচু হয়ে স্থির বসে থাকুন।
আটঘর-কুড়িয়ানার দিকে
সময় আর জোয়ার-ভাটা অনুকূল হলে ইঞ্জিনের নৌকা আপনাকে খাল ধরে নিয়ে যাবে পিরোজপুর জেলায়, স্বরূপকাঠির কাছে প্রতিবেশী হাট আটঘর-কুড়িয়ানায়। পেয়ারার দেশে কুড়িয়ানার হাট সবচেয়ে বড়গুলোর একটি, চারপাশের খালের দুই ধারে বাগান, নারকেলগাছ আর গ্রামের বাড়ি। স্বরূপকাঠি নিজে কাঠের শহর, কাঠের বাজার আর নৌকা তৈরির জন্য পরিচিত।
পিরোজপুরের আরও দক্ষিণে নাজিরপুরের জলাভূমিতে আছে পানির ওপর চাষের আরেক পুরোনো রীতি: ভাসমান বাগান, কচুরিপানার ধাপে বন্যার মৌসুমজুড়ে কৃষকেরা চারা আর সবজি ফলান। সেটা আলাদা ভ্রমণ, তবে জেনে রাখার মতো।
বরিশালে ফেরা, আর দুর্গাসাগর
বিকেলে পুবে ফিরে শহর থেকে বরিশাল–বানারীপাড়া সড়ক ধরে যান দুর্গাসাগরে। স্থানীয় প্রচলিত কথা অনুযায়ী মাধবপাশার এই বিশাল পুরোনো দিঘি অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে চন্দ্রদ্বীপের এক রাজা খনন করান, নাম দেন মা রানি দুর্গাবতীর নামে। যে বদ্বীপে নদীর পানি ঘোলা, সেখানে মানুষকে পরিষ্কার পানি দিতেই এমন দিঘি কাটা হতো।
আজ এটি গাছে ঘেরা চওড়া, ছায়াময় এক জলাশয়, চারপাশে হাঁটার পথ, মাঝখানে গাছপালায় ঢাকা ছোট্ট দ্বীপ। খালের কোলাহলের পর এই নীরবতা প্রায় চমকে দেয়। আলো নরম হতে হতে আপনি পুরো চক্কর ঘুরে আসেন। শীতে পানিতে পাখি জড়ো হয়; বর্ষায় দিঘি শুধুই সবুজ আর স্থির।
একই পথে আরও এগোলে বাগান আর পুকুরের মাঝে সুবিশাল গুঠিয়া মসজিদ; শক্তি থাকলে সহজেই যোগ করা যায়। সিএনজিতে গেলে অন্ধকারের আগেই ফেরা শুরু করুন।
নদীর ধারে সন্ধ্যা
রাতে শহরে ফিরে আবার কীর্তনখোলার ধারে হাঁটেন। ঢাকার লঞ্চগুলো ভরছে, আলো জ্বলছে, হর্ন বাজছে। হয়তো এর একটাতেই বাড়ি ফিরবেন। হয়তো সেতু পেরোনো বাসে মাঝরাতের আগেই ঢাকা। যেভাবেই ফিরুন, খালগুলো মনে থাকবে: সবুজ পানি, সবুজ ফল, আর সকালে নৌকায় নৌকায় মৃদু ঠোকাঠুকির শব্দ।
এই ভ্রমণের পরিকল্পনা
- সেরা সময়: ভাসমান পেয়ারার হাটের জন্য জুলাই থেকে আগস্ট, কখনো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত; ভোরে যান। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি ঠান্ডা আবহাওয়া আর শান্ত নদী, তবে পেয়ারার হাট থাকে না।
- বাসে বা লঞ্চে: ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে বরিশাল মোটামুটি ৪–৫ ঘণ্টা। বরিশালের বাস খুঁজুন। রাতের লঞ্চ সন্ধ্যায় সদরঘাট ছেড়ে পরদিন ভোরে পৌঁছায়; ঈদ আর ছুটির সপ্তাহান্তের আগে কেবিন আগেভাগে বুক করুন।
- বরিশাল থেকে: ঝালকাঠি ৩০–৪৫ মিনিট, সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় ভীমরুলি আরও ৩০–৪৫ মিনিট। আটঘর-কুড়িয়ানার জন্য স্বরূপকাঠি বরিশাল থেকে বাসে প্রায় ১–১.৫ ঘণ্টা।
- আরও পড়ুন: আমাদের বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলা গাইড, আর শহরে সন্ধ্যার হাঁটার জন্য অক্সফোর্ড মিশন চার্চ।
- #Barishal
- #floating market
- #guava
- #Jhalokati
- #launch
- #travel story