রাতের বাসে কক্সবাজার: ঢাকা থেকে ভোরের সমুদ্রে

ঢাকা থেকে কক্সবাজারের রাতের বাসযাত্রা কেমন লাগে: সন্ধ্যার কাউন্টার, মহাসড়কের বিরতি, ভোরের আগে পাহাড়, বঙ্গোপসাগরের প্রথম দেখা আর সৈকতে একটি লম্বা প্রথম দিন।

৪ মিনিটে পড়া যাবে

রাতের বাসের একটা আলাদা উত্তেজনা আছে। সন্ধ্যায় এক জগৎ ছেড়ে বের হন, মাঝখানের পথটা ঘুমিয়ে কাটান, আর চোখ খুলে দেখেন সম্পূর্ণ অন্য এক জায়গা। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের পথে সেই জায়গাটা দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত।

সন্ধ্যার কাউন্টার

শহরে বাতি জ্বলে ওঠার সময় আপনি কাউন্টারে পৌঁছান। অপেক্ষার ঘর ভরা: মাদুর আর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে পরিবার, একই রঙের টি-শার্ট পরা বন্ধুদের দল, সদ্য বিয়ে হওয়া এক দম্পতি, ছোট ব্যাকপ্যাক কাঁধে একা কয়েকজন যাত্রী। কেউ জানালার পাশের সিট নিয়ে আস্তে দরদাম করছেন। ঝুড়ি হাতে এক ছেলে বাদাম আর পানি বিক্রি করছে। বাইরে সারি সারি কোচ দাঁড়িয়ে, ইঞ্জিন চলছে, কিছুক্ষণ পরপর সুপারভাইজার ছাড়ার সময় আর কোচ নম্বর ডাকছেন।

টিকিটটা আরেকবার দেখে নেন, ব্যাগ নিচের বক্সে তুলে দেন, তারপর বাসে ওঠেন। সিটটা ভাবনার চেয়ে চওড়া। লিভার খুঁজে একটু হেলান দিয়ে বসেন, শেষ যাত্রীরা কীভাবে গুছিয়ে বসছেন দেখতে থাকেন।

শহর পেছনে ফেলে

প্রথম ঘণ্টাটাই সবচেয়ে ধীর। সন্ধ্যার যানজট ঠেলে বাস এগোয় ঝলমলে দোকান, ফ্লাইওভার আর রিকশার ঘণ্টার ভিড় পেরিয়ে। তারপর শহরের সীমা ছাড়াতেই রাস্তা খুলে যায়, ইঞ্জিন নিজের ছন্দ পায়। ভেতরের বাতি নিভু নিভু হয়ে আসে, সামনের পর্দায় আস্তে একটা সিনেমা চলে, অর্ধেক বাস ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।

জানালার বাইরে মহাসড়ক টুকরো টুকরো হয়ে সরে যায়: রাস্তার ধারের চায়ের দোকানের আলো, ফুল আর লেখায় রাঙানো ট্রাক, সবুজ বাতিতে জ্বলা মসজিদ, অন্ধকারে টের পাওয়া ধানখেত। হালকা ঘুম হলে ঘাড়ের বালিশ আর একটা চাদর খুব কাজে দেয়, কারণ মাঝরাতের মধ্যে এসির বাতাসে কেবিন বেশ ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে।

মাঝরাতের বিরতি

কয়েক ঘণ্টা পর, সাধারণত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোথাও, বাস থামে বড় একটি হাইওয়ে রেস্তোরাঁয়। সবাই চোখ কচলাতে কচলাতে নামে তীব্র আলোর মধ্যে। তাওয়ায় পরোটার গন্ধ, কড়া দুধ-চা, থালার ঠুংঠাং, ওয়াশরুমের সামনে লাইন। হাত-পা একটু টানটান করে নেন, গরম কিছু খান, আর শোনেন সুপারভাইজার যাত্রী গুনছেন, তারপর বাস আবার ছাড়ে।

এরপর রাত গভীর হয়। তন্দ্রা আসে, ঘুমন্ত কোনো শহরের ভেতর দিয়ে বাস ধীরে চলার সময় চোখ খোলে, আবার তন্দ্রা। একসময় চট্টগ্রামের মোড় পেরিয়ে যায়, রাস্তার চেহারা বদলায়: সোজা পথ কমে, বাঁক বাড়ে, দুই পাশে নিচু পাহাড়ের কালো রেখা।

প্রথম আলো

আকাশ ধূসর হতে শুরু করলে পুরোপুরি জেগে ওঠেন। বাস এখন সবুজ এলাকার ভেতর দিয়ে দক্ষিণে ছুটছে: সুপারিগাছ, ছোট পুকুর, গাছে ঢাকা টিলা। নিচু জায়গায় কুয়াশা জমে আছে। মানুষ এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছে: সবজি বোঝাই সাইকেল ঠেলছেন কেউ, শিশুরা মাদ্রাসায় যাচ্ছে, কোনো উঠান থেকে রান্নার ধোঁয়া উঠছে।

যাত্রায় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, তাই রাতের বেশির ভাগ বাস ভোরে বা সকালের শুরুতে কক্সবাজার পৌঁছায়। শহরটা প্রথমে ধীরে, তারপর একসঙ্গে সামনে চলে আসে: হোটেল, সাইনবোর্ড, যাত্রীর অপেক্ষায় ইজিবাইকের সারি। বাস থামে কলাতলী রোডের কাউন্টারে, আর নেমেই টের পান বাতাসে হালকা নোনা গন্ধ।

সমুদ্রের প্রথম দেখা

পথ জিজ্ঞেস করতে হয় না। রাস্তা ধরে, রাস্তার শেষ মাথার দিকে হাঁটা মানুষের পিছু পিছু চলেন, আর হঠাৎ দালানকোঠা শেষ হয়ে যায়, সামনে বঙ্গোপসাগর: ধূসর-নীল, বিশাল, লম্বা সাদা রেখায় ঢেউ ভাঙছে বালির ওপর। পরিষ্কার সকালে আলোটা নরম, রুপালি, আর সৈকত দক্ষিণে যত দূর চোখ যায় ছড়িয়ে আছে।

এখানে কিছুক্ষণ শুধু দাঁড়িয়ে থাকুন। জেলেরা জাল টানছেন। একজন ফটোগ্রাফার এর মধ্যেই এক পরিবারকে ছবি তোলার প্রস্তাব দিচ্ছেন। ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে সওয়ারির অপেক্ষায়। ঢেউয়ের শব্দ একটানা, ভাবনার চেয়ে জোরালো, আর পায়ের নিচে বালি ঠান্ডা।

সৈকতে প্রথম দিন

হোটেলে উঠে ব্যাগ রাখুন, গোসল সেরে আবার ফিরে আসুন। নাশতা হতে পারে কাউন্টারের কাছের ছোট কোনো দোকানে পরোটা, ডিম আর চা।

বেলা বাড়লে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মূল অংশ, লাবণী, সুগন্ধা আর কলাতলী পয়েন্টের মাঝখানটা জমজমাট হয়ে ওঠে। সমুদ্রে নামতে চাইলে এখানেই নামুন, পতাকার মাঝখানে আর লাইফগার্ড থাকার সময়: বঙ্গোপসাগরের স্রোত শক্তিশালী হতে পারে, তাই গভীরে যাবেন না, অন্ধকারে তো নয়ই। একটা বিচ চেয়ার আর ছাতা ভাড়া নিন, ডাব খান, আর ভিড় দেখুন: বালির দুর্গ বানানো শিশু, ঢেউয়ের দিকে দৌড়ানো বন্ধুরা, পানির কিনারা ধরে হাঁটা দম্পতি।

দুপুরে রোদ কড়া হয়, বিশেষ করে শীতের বাইরে। এটাই দুপুরের খাবার আর বিশ্রামের সময়। এখানে খাওয়ার মূল আকর্ষণ সামুদ্রিক মাছ: ভাজা মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, আর শুঁটকির দোকান, যার গন্ধে শহরের পুরো গলি ভরে থাকে।

সমুদ্রে সূর্যাস্ত

বিকেলে সৈকত আবার জেগে ওঠে। সৈকতটা পশ্চিমমুখী, তাই সূর্য ডোবে সমুদ্রেই; পরিষ্কার সন্ধ্যায় আকাশ কমলা, তারপর গোলাপি, তারপর গাঢ় নীল হয়। পানিতে প্রতিটি রং ধরা পড়ে। পরিবারগুলো পানির কিনারে জড়ো হয়, আর কয়েক মিনিটের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত পয়েন্টও চুপ হয়ে যায়।

অন্ধকার নামলে সৈকতের দোকানগুলোয় ভাজাপোড়া আর গ্রিল করা মাছের আলো জ্বলে, বাজারের গলি ভরে যায় ঝিনুকের গয়না, আচার আর শুঁটকিতে। জুতায় বালি নিয়ে হোটেলে ফেরেন, মাথায় এর মধ্যেই কালকের পরিকল্পনা।

পরের দিনগুলো

আরও এক-দুই দিন থাকলে সিএনজি বা জিপে মেরিন ড্রাইভ ধরে দক্ষিণে যান, এক পাশে সমুদ্র আর অন্য পাশে বনঘেরা পাহাড়। পাহাড়ের ওপর থেকে দৃশ্য আর বর্ষায় ঝরনা দেখতে থামুন হিমছড়িতে, তারপর চলে যান ইনানী সৈকতে, যেখানে তীরজুড়ে কালো পাথর আর পানি সাধারণত শান্ত। আরও সহজ ভ্রমণ হলো রামুর বৌদ্ধ বিহার আর নৌকায় মহেশখালী দ্বীপ।

এই ভ্রমণের পরিকল্পনা

  • সেরা সময়: নভেম্বর থেকে মার্চ, যখন সমুদ্র শান্ত আর আকাশ পরিষ্কার। বর্ষায় (মোটামুটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর) সমুদ্র উত্তাল থাকে, প্রায়ই সমুদ্রে নামা বন্ধ থাকে। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটিতে প্রচণ্ড ভিড়।
  • বাসে: ঢাকা থেকে বাসে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, বেশির ভাগই রাতের, থামে কলাতলী রোডের কাউন্টারগুলোয়। ছুটির দিনের জন্য আগেভাগে টিকিট কাটুন। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বাস খুঁজুন, অথবা অন্য শহর থেকে বাস খুঁজুন।
  • সৈকতে: কেবল পতাকার মাঝখানে আর লাইফগার্ড থাকার সময় সমুদ্রে নামুন; রাতে কখনো নয়।
  • আরও পড়ুন: আমাদের কক্সবাজার ভ্রমণ গাইড আর কক্সবাজার জেলা গাইড।
  • #Cox's Bazar
  • #night bus
  • #travel story
  • #beach
  • #Dhaka to Cox's Bazar

ব্লগ