পুরান ঢাকায় একদিন: কেল্লা, তারা মসজিদ, নদী আর কাচ্চি বিরিয়ানি

পুরান ঢাকায় একটি দিন: সকালের আলোয় লালবাগ কেল্লা, আরমানিটোলার গলি, আহসান মঞ্জিলের গোলাপি প্রাসাদ, সদরঘাটে খেয়া নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার, আর শেষে কাচ্চি বিরিয়ানি ও বাকরখানি।

৪ মিনিটে পড়া যাবে

পুরান ঢাকা গাড়ির জানালা দিয়ে ধরা দেয় না। এ এমন এক শহর, যার গলিতে গাড়ি ঢোকে না; রিকশার ঘণ্টা আর কারখানার হাতুড়ির শব্দ, দোকানের আড়ালে লুকানো মোগল দেয়াল আর ঔপনিবেশিক প্রাসাদ। একে দেখতে হলে হাঁটতে হয়, রিকশায় চড়তে হয়, একটু হারিয়ে যেতে হয়, আর ভালো করে খেতে হয়। ভোরে শুরু করলে প্রেমে পড়ার জন্য একদিনই যথেষ্ট।

লালবাগ কেল্লায় সকাল

ফটক খোলার সময়, বাতাস যখন নরম, তখন পৌঁছান লালবাগ কেল্লায়। দেয়ালের ভেতরে ঢুকতেই শহরের শব্দ মিলিয়ে যায়। লম্বা লন আর সোজা পথ চলে গেছে তিনটি স্থাপনার মাঝে: একটি মসজিদ, হাম্মামসহ একটি দরবার হল, আর মার্বেল ও টালিতে মোড়া পরী বিবির সমাধি।

কেল্লার কাজ শুরু হয় ১৬৭৮ সালে, সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজমের হাতে; পরে কাজের ভার পান সুবাদার শায়েস্তা খাঁ। কেল্লা কখনো শেষ হয়নি। শায়েস্তা খাঁর মেয়ে পরী বিবি এখানেই মারা যান, আর অনেকের মতে তিনি এটাকে অশুভ লক্ষণ ধরে নেন। ভোরের আলোয় এর অসমাপ্ত রেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, দেয়ালে কবুতর আর ঘাসে পানি দেওয়া মালিদের মাঝে, জায়গাটার আধখানা বলা গল্পটা টের পান।

খোলার দিন বদলায়, তাই যাওয়ার আগে জেনে নিন। বাইরে লালবাগ আর চকবাজারের গলিতে এর মধ্যেই ব্যস্ততা। কোনো দোকানে এক কাপ চা আর তন্দুর থেকে সদ্য নামানো গরম বাকরখানি খান, স্তরে স্তরে মচমচে যে রুটি পুরান ঢাকা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বানিয়ে আসছে।

রিকশায় আরমানিটোলা

এবার রিকশা। পুরান ঢাকার আনন্দের অর্ধেকই এখানে: চালক রিকশার চেয়ে সামান্য চওড়া গলির ভেতর দিয়ে, মাথার ওপর তারের জট পেরিয়ে, মসলার দোকান, কাগজের আড়ত, মিষ্টির দোকান আর পণ্যে ঠাসা পাইকারি বাজারের পাশ দিয়ে এগোন। হর্ন, ঘণ্টা আর হাঁকডাক মিলে একটানা শব্দ। শক্ত করে ধরে বসুন, ব্যাগ কোলে রাখুন, আর মাথা তুলে পুরোনো বারান্দাগুলো দেখুন।

আরমানিটোলায় রিকশা থামে তারা মসজিদের সামনে। এটি উনিশ শতকের শুরুতে তিন গম্বুজের সাদামাটা মসজিদ হিসেবে তৈরি, আর বিশ শতকের শুরুতে একে ঢেকে দেওয়া হয় চিনিটিকরি দিয়ে: পলেস্তারায় বসানো হাজার হাজার ভাঙা চীনামাটি আর টালির টুকরো, নীল তারা, ফুল আর নকশায়। সকালের আলোয় পুরো সম্মুখভাগ ঝলমল করে। শালীন পোশাক পরুন, যেখানে বলা আছে জুতা খুলুন, আর নামাজের সময় এড়িয়ে চলুন।

কয়েক মিনিটের হাঁটাপথে আর্মেনীয় গির্জা, ১৭৮১ সালে সেই বণিকদের তৈরি, যাঁদের নামে আরমানিটোলার নাম। দেয়ালের ভেতরে শান্ত কবরস্থান, আর্মেনীয় লিপিতে খোদাই করা পুরোনো সমাধিফলক। ফটক কখনো বন্ধ থাকে, তত্ত্বাবধায়ককে ডেকে ঢুকতে হতে পারে। বন্ধ থাকলেও গলি থেকে দেখে আসা যায়।

নদীর ধারে গোলাপি প্রাসাদ

এরপর নদী। হেঁটে বা রিকশায় বুড়িগঙ্গার দিকে নামেন, আর নদীর পাড়ের ওপর দেখা দেয় আহসান মঞ্জিলের গোলাপি সম্মুখভাগ, বিশাল সিঁড়ি আর গম্বুজসহ।

এটি ছিল ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ, ১৮৭২ সালে নির্মাণ শেষ হয়, ১৮৮৮ সালের টর্নেডোর পর আবার গড়া হয়। আজ এটি জাদুঘর। ভেতরে সংস্কার করা কক্ষগুলোয় দেখা যায় নবাব পরিবার কীভাবে থাকতেন: জলসাঘর, খাবারঘর, প্রতিকৃতি আর আসবাব। জাদুঘর সপ্তাহে এক দিন আর কিছু সরকারি ছুটিতে বন্ধ থাকে, তাই আগে জেনে নিন, আর গ্যালারির ভেতরে ছবি তোলার নির্দেশনা মেনে চলুন। সম্মুখভাগের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সামনের লন থেকে, অথবা নদী থেকে।

খেয়ায় বুড়িগঙ্গা পার

আহসান মঞ্জিল থেকে অল্প হাঁটলেই সদরঘাট, ঢাকার প্রধান নদীবন্দর। শহরের নদীজীবন এখানে পুরো মাত্রায়। পাড় ধরে নোঙর করা বিশাল বহুতল লঞ্চ, উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা নাম, সন্ধ্যায় দক্ষিণে যাত্রার অপেক্ষায়। কুলিরা মাথায় বোঝা নিয়ে ভারসাম্য রাখছেন। ফেরিওয়ালারা খাবার থেকে সানগ্লাস পর্যন্ত সব বিক্রি করছেন।

ঘাটে নামলে দেখবেন ছোট কাঠের খেয়া নৌকা সারা দিন বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেরানীগঞ্জে যাচ্ছে। ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করুন, নিচু হয়ে বসুন, নড়াচড়া কম করুন। মাঝি পাড় ছাড়তেই শব্দ নরম হয়ে আসে। লঞ্চের বিশাল খোলের মাঝ দিয়ে ভেসে চলেন, কাঠে পানির ছলাৎ ছলাৎ, আর নদী থেকে পেছন ফিরে দেখেন আহসান মঞ্জিল। পারাপার ছোট, কিন্তু দেখিয়ে দেয় ঢাকা কীভাবে গড়ে উঠেছে: পানির দিকে মুখ করে, পানির ওপর নির্ভর করে।

ঘাটে ফোন আর মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন; ভিড় বেশি, আর পন্টুন পিচ্ছিল হতে পারে।

দুপুরে কাচ্চি বিরিয়ানি

এতক্ষণে খিদে পেয়েছে, আর পুরান ঢাকাও প্রস্তুত। যান নাজিরা বাজার আর বংশালে, পুরান ঢাকার খাবারের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে হাজির বিরিয়ানির মতো বিরিয়ানির দোকান গত শতক থেকে রান্না করে আসছে। দুপুরে যান, যখন ডেকচি ভরা থাকে।

আসল পদ কাচ্চি বিরিয়ানি: খাসির মাংস আর সুগন্ধি চাল একসঙ্গে মুখবন্ধ ডেকচিতে রান্না, যাতে কাঁচা মাংস আর চাল একে অপরের স্বাদে ভাপে সেদ্ধ হয়, ভেতরে কোথাও লুকিয়ে থাকে নরম একটা আলু। সঙ্গে খান বোরহানি, মসলাদার দইয়ের পানীয়। তারপর কোনো মিষ্টির দোকানে ঠান্ডা কিছু, আর চায়ের দোকানে আরেক কাপ চা, আরেকটা বাকরখানি।

বিকেল

শক্তি বাকি থাকলে হেঁটে যান ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু মন্দিরগুলোর একটি, অথবা রিকশা নিন পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা আর কার্জন হলের দিকে। আলো কমে এলে পুরান ঢাকার গলি আবার ভরে যায়, কারখানার হাতুড়ি চলতেই থাকে, আর শহর চলে শতাব্দী ধরে যেভাবে চলেছে।

এই ভ্রমণের পরিকল্পনা

  • সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ, যখন দিন শুকনো আর হাঁটার মতো মৃদু। গরম আর ভিড় এড়াতে ভোরে শুরু করুন। জানুয়ারির মাঝামাঝি ছাদে ছাদে ঘুড়ির উৎসব সাকরাইন।
  • পৌঁছানো: অন্য শহর থেকে বাসে ঢাকা এলে বাস খুঁজুন; কোচ কোথায় নামাবে দেখে হোটেলের সবচেয়ে কাছের স্টপ বেছে নিন। শহরের ভেতরে গুলিস্তান বা বংশাল থেকে রিকশায় পুরান ঢাকায় ঢুকুন।
  • টিপস: মসজিদ ও মন্দিরে শালীন পোশাক পরুন, রিকশা আর নৌকার জন্য খুচরা টাকা রাখুন, আগে ভাড়া ঠিক করুন, আর আরামদায়ক জুতা পরুন।
  • আরও পড়ুন: আমাদের ঢাকা ভ্রমণ গাইড আর ঢাকা জেলা গাইড। বাসে একদিনের ভ্রমণে যেতে পারেন সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরে।
  • #Old Dhaka
  • #Dhaka
  • #Lalbagh Fort
  • #Ahsan Manzil
  • #food
  • #travel story

ব্লগ