সাজেক ভ্যালির সূর্যোদয়: পার্বত্য চট্টগ্রামে মেঘের ওপর এক রাত

ধাপে ধাপে সাজেক ভ্যালির যাত্রা: খাগড়াছড়ির রাতের বাস, খোলা জিপ আর নিরাপত্তা বহরের পাহাড়ি পথ, রুইলুই পাড়ার পাহাড়চূড়ায় একটি সন্ধ্যা, আর সেই ভোর, যখন নিচের উপত্যকাগুলো মেঘে ভরে যায়।

৪ মিনিটে পড়া যাবে

কিছু জায়গা বিখ্যাত একটি মুহূর্তের জন্য। সাজেকে সেই মুহূর্ত আসে সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন ঠান্ডায় পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি মেঘ দেখেন ওপরে নয়, নিচে তাকিয়ে। সেখানে পৌঁছাতে লাগে রাতের বাস, একটি জিপ আর পাহাড়ের ভেতর দিয়ে লম্বা চড়াই, আর পথের প্রতিটি অংশই মন দিয়ে দেখার মতো।

খাগড়াছড়ির রাতের বাস

সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে বাসে ওঠেন। খাগড়াছড়ি শহর পর্যন্ত লাগে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা, বেশির ভাগই রাতে, ফেনী হয়ে তারপর রামগড় দিয়ে পাহাড়ে ওঠা। প্রথম অর্ধেকটা কাটে মহাসড়কের চেনা, সমান ঘুমে। শেষ কয়েক ঘণ্টায় বদলটা টের পান: বাস বাঁকে বাঁকে হেলে পড়ে, চড়াইয়ে ইঞ্জিন হাঁপায়, আর জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাস ঠান্ডা হয়ে ভেজা পাতার গন্ধ নিয়ে আসে।

জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট হাতের কাছে রাখুন। পাহাড়ি পথে তল্লাশিচৌকি আছে, যাওয়ার পথে আপনার তথ্য দেখা ও লিখে রাখা হতে পারে। বিদেশিদের আলাদা অনুমতি লাগতে পারে; পরিকল্পনার আগে বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।

ভোরে পৌঁছান খাগড়াছড়িতে, চেঙ্গী নদীর ধারে পাহাড়ঘেরা এক সবুজ উপত্যকায়। শহর সবে জাগছে। বাস কাউন্টারের কাছের দোকানে চা ঢালা হচ্ছে, আর স্থানীয়রা যাকে চাঁদের গাড়ি বলে, সেই খোলা পেছনের জিপগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে সাজেকের যাত্রীর অপেক্ষায়।

জিপ আর নিরাপত্তা বহরের পথ

নাশতা সেরে দলের সঙ্গে জিপের পেছনে উঠে বসেন। দুই পাশে বেঞ্চ, মাথার ওপর ধরে রাখার রড। এটার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ থাকবেন।

সাজেক ভ্যালির পথ প্রায় ৭০ কিলোমিটার, দীঘিনালা হয়ে বাঘাইহাট, সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। সাধারণত বাঘাইহাট তল্লাশিচৌকি থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সেনা নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে দল বেঁধে গাড়ি ওঠে, তাই চালক সময় মিলিয়ে চালান। সময়সূচি বদলায়, তাই রওনার আগে বর্তমান ব্যবস্থা জেনে নিন।

তারপর শুরু হয় চড়াই। রাস্তা পাহাড়ের শিরদাঁড়া ধরে পেঁচিয়ে ওঠে-নামে, এক পাশে খাড়া ঢাল, অন্য পাশে জঙ্গল। ঢাল আঁকড়ে আছে কলাবাগান আর জুমখেত। গ্রামের শিশুরা রাস্তার ধার থেকে হাত নাড়ে, কখনো জিপের পাশে পাশে দৌড়ায়। মুখে বাতাস, বাঁকে বাঁকে ইঞ্জিনের গর্জন, আর প্রতিটি চূড়ায় নতুন দৃশ্য: পাহাড়ের পর পাহাড়, দিগন্ত পর্যন্ত নীলচে-সবুজ।

রুইলুই পাড়ায় একটি বিকেল

সাজেক রাঙামাটি জেলার একেবারে উত্তরে, মিজোরাম সীমান্তঘেঁষা একটি ইউনিয়ন। এর প্রাণকেন্দ্র রুইলুই পাড়া, উঁচু পাহাড়চূড়া ধরে লম্বা হয়ে থাকা একটি গ্রাম, ঢালে খুঁটির ওপর ঘর, ছোট গির্জা আর বাগান। এখানকার গ্রামে মূলত লুসাই, পাংখোয়া আর ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বাস। হাঁটার সময় মনে রাখুন, এগুলো মানুষের বাড়ি, সাজানো মঞ্চ নয়: কারও ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, কথা বলুন আস্তে।

কটেজে উঠে দুপুরের খাবার খেয়ে হাঁটতে বের হন। রুইলুই পাড়া এত ছোট যে অল্প সময়েই এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটা যায়। বিকেলে হেলিপ্যাডে যান, সূর্যাস্ত দেখতে সবাই সেখানে জড়ো হয়। মিজোরামের পাহাড়ের ওপর আকাশ সোনালি হয়, তারপর বেগুনি, আর উপত্যকাগুলো ছায়ায় ভরে যায়।

পাহাড়চূড়ায় সন্ধ্যা

সূর্য ডুবলে ঠান্ডা নামে দ্রুত, বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে, তাই গরম কাপড় সঙ্গে রাখুন। চূড়া ধরে বাতি জ্বলে ওঠে। রান্নার আগুন থেকে ধোঁয়া ওঠে, কোথাও পোড়ানো হচ্ছে ব্যাম্বু চিকেন: মসলা মাখানো মুরগি কাঁচা বাঁশের চোঙে ভরে আগুনে রান্না, সাজেকের সন্ধ্যার চেনা খাবার। চাদর মুড়ি দিয়ে কাঠের বারান্দায় বসে খান, চারপাশে অন্ধকার পাহাড়, আকাশে শহরের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল তারা।

এখানে বিদ্যুৎ আর মোবাইল নেটওয়ার্ক অনিয়মিত হতে পারে, তাই সুযোগ পেলেই পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিন। তারপর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন। ভোরের আগেই উঠতে হবে।

পায়ের নিচে মেঘ

অন্ধকারে অ্যালার্ম বাজে। সঙ্গে আনা সব কাপড় গায়ে চাপিয়ে বাইরে আসেন। চূড়া নিস্তব্ধ, বাতাস ধারালো। ছোট একটা জিপযাত্রায় যান একটু দূরের কংলাক পাড়ার দিকে, তারপর টর্চ হাতে হাঁপাতে হাঁপাতে খাড়া পথ বেয়ে চূড়ায় ওঠেন।

চূড়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা। পাহাড়ের পেছনে আকাশ ধীরে ধূসর, তারপর ফিকে কমলা হয়। আর তখনই চোখে পড়ে: নিচের উপত্যকাগুলো মেঘে ভরা। ভালো সকালে, সাধারণত বৃষ্টির পর, পাহাড়ের সারির মাঝখানে মেঘ শুয়ে থাকে সাদা সমুদ্রের মতো, আর পাহাড়চূড়াগুলো তার ভেতর থেকে মাথা তোলে দ্বীপের মতো। সূর্য উঠলে আলো ছড়িয়ে পড়ে মেঘের ওপর, সোনালি আর গোলাপি হয়ে যায়। কেউ তেমন কথা বলে না।

এটা নিশ্চিত নয়। কোনো সকালে আকাশ পরিষ্কার, উপত্যকা কেবলই সবুজ; কোনো সকালে আপনি নিজেই মেঘের ভেতরে, কিছুই দেখা যায় না। সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বর্ষার শেষ থেকে শীতের শুরু, মোটামুটি আগস্ট থেকে নভেম্বর।

ফেরার পথ

নাশতার পর আবার নিরাপত্তা বহরে যোগ দিয়ে নেমে আসেন খাগড়াছড়িতে, পাহাড়গুলো এখন চেনা। রাতের বাসের আগে সময় থাকলে থামুন আলুটিলা গুহায়, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গ, যা টর্চ হাতে হেঁটে পার হতে হয়, অথবা রিসাং ঝরনায়, যা ঢালু পাথরের গা বেয়ে নামে।

এই ভ্রমণের পরিকল্পনা

  • সেরা সময়: ভোরে মেঘ দেখার সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনার জন্য আগস্ট থেকে নভেম্বর; পরিষ্কার আকাশ আর ঠান্ডা রাতের জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।
  • বাসে: ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি শহরে সরাসরি বাসে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা, বেশির ভাগই রাতের। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। বাস খুঁজুন, অথবা পথে চট্টগ্রামে থামলে দেখুন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাস।
  • জিপ: খাগড়াছড়িতে চাঁদের গাড়ি ভাড়া করুন, সাধারণত আসা-যাওয়া মিলিয়ে, আর বাঘাইহাট থেকে বহরের বর্তমান সময়সূচি জেনে নিন।
  • নিয়ম: জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট সঙ্গে রাখুন; বিদেশিরা পার্বত্য এলাকার বর্তমান নিয়ম জেনে নিন। অন্তত এক রাত থাকুন: ভোরটাই আসার কারণ।
  • আরও পড়ুন: আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ গাইড আর রাঙামাটি জেলা গাইড; আরেক দিনের জন্য কাপ্তাই হ্রদ।
  • #Sajek Valley
  • #Khagrachhari
  • #Hill Tracts
  • #sunrise
  • #travel story

ব্লগ