পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ গাইড: রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও সাজেক
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণের পরিকল্পনা: বাসে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও সাজেক ভ্যালি যাওয়া, যাওয়ার আগে চেকপোস্ট ও পর্যটকদের নিয়ম জেনে নেওয়া, সেরা মৌসুম, আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান রেখে ভ্রমণ।
৪ মিনিটে পড়া যাবে

দেশের সবচেয়ে আলাদা ভূদৃশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে: খাড়া সবুজ পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, সাজেকের চূড়ার নিচে মেঘ, আর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, ম্রোসহ বহু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতি। এই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ গাইডে আছে তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি, সঙ্গে সাজেক ভ্যালি, আর বাস্তব দিকগুলো: কীভাবে যাবেন, কোন নিয়ম জেনে নেবেন আর কীভাবে ভালোভাবে ঘুরবেন।
এক নজরে তিন পার্বত্য জেলা
- রাঙামাটি হ্রদের জেলা, কাপ্তাই হ্রদের পাহাড় আর দ্বীপজুড়ে ছড়ানো, চাকমা জীবনের কেন্দ্র
- বান্দরবানে দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়, সাঙ্গু নদী আর সবচেয়ে দুর্গম ট্রেকিং
- খাগড়াছড়ি চেঙ্গী নদীর তীরে উপত্যকার শহর, সাজেক ভ্যালির প্রবেশদ্বার
প্রতিটির জন্য অন্তত দুই রাত রাখা ভালো। অল্প সময়ে তিনটিই দেখতে চাইলে আঁকাবাঁকা পথে অনেক ঘণ্টা কেটে যায়।
বাসে কীভাবে যাবেন
তিন জেলা শহরেই ঢাকা থেকে সরাসরি বাস আছে, বেশির ভাগ রাতের:
- ঢাকা থেকে রাঙামাটি: চট্টগ্রাম হয়ে প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা
- ঢাকা থেকে বান্দরবান: চট্টগ্রাম ও কেরানীহাট হয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা
- ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি: ফেনী ও রামগড় হয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা
আরেকটি উপায় হলো ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে গিয়ে সেখানে বাস বদলানো। চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি ও বান্দরবান প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা, খাগড়াছড়ি প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।
চেকপোস্ট ও পর্যটকদের নিয়ম: যাওয়ার আগে জেনে নিন
দেশের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে পাহাড়ে এটা বেশি জরুরি।
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট সঙ্গে রাখুন, কয়েকটি ফটোকপিসহ। পাহাড়ি সড়কে সেনা ও পুলিশ চেকপোস্টে তা দেখা ও লিখে রাখা হয়।
- বিদেশি পর্যটকদের বাড়তি অনুমতি লাগতে পারে। যাত্রার বেশ আগেই বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।
- প্রবেশাধিকার বদলায়। রুমা ও থানচিসহ বান্দরবানের কিছু এলাকা নিরাপত্তার কারণে মাঝে মাঝে পর্যটকদের জন্য বন্ধ থেকেছে। পরিকল্পনার আগে এবং রওনার আগে আবার বর্তমান অবস্থা জেনে নিন।
- বগা লেক ও নাফাখুমের মতো ট্রেকে নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড বাধ্যতামূলক। গাইডের নির্দেশমতো উপজেলা শহরে ও পথের ক্যাম্পে পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিবন্ধন করতে হয়।
- সাজেকে সাধারণত দলবদ্ধভাবে যাওয়া হয়। বাঘাইহাট চেকপোস্ট থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সেনা পাহারায় গাড়ির বহর ওপরে উঠেছে। বর্তমান সময়সূচি জেনে নিন।
এখানকার নিয়ম কর্তৃপক্ষ ঠিক করে, আর অল্প সময়ের নোটিশে বদলাতে পারে। অনলাইনে যা পড়বেন, এই গাইডসহ, তা শুরুর ধারণা হিসেবে নিন এবং স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন।
রাঙামাটি ও কাপ্তাই হ্রদ
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে কর্ণফুলীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে তৈরি হয় কাপ্তাই হ্রদ। এর জলে ডুবে যায় উপত্যকা, গ্রাম আর চাকমা রাজার পুরোনো রাজবাড়ি; ঘরবাড়ি হারান হাজার হাজার মানুষ, যে ক্ষতির স্মৃতি এখানে আজও রয়ে গেছে। আজ এখানে নৌকা রাস্তার মতোই সাধারণ।
- সারা দিনের জন্য ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে যান শুভলং ঝরনায়, প্রতি দিকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, বর্ষায় সবচেয়ে ভরা
- হ্রদের ধারে বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার রাজবন বিহার ঘুরে আসুন
- প্রতিটি নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরুন আর অন্ধকারের আগে ফিরে আসুন
সাজেক ভ্যালি
সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় হলেও যেতে হয় খাগড়াছড়ি শহর থেকে: দীঘিনালা ও বাঘাইহাট হয়ে চান্দের গাড়িতে (খোলা জিপ) প্রায় ৭০ কিলোমিটার, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। জিপ ভাড়া হয় খাগড়াছড়িতে, সাধারণত যাওয়া-আসা মিলিয়ে।
পর্যটকদের মূল কেন্দ্র রুইলুই পাড়া, উঁচু শৈলশিরা ধরে গড়ে ওঠা গ্রাম; সূর্যোদয়ের জন্য একটু দূরে কংলাক পাড়া। পরিষ্কার সকালে নিচের উপত্যকা মেঘে ভরে যায়। অন্তত এক রাত থাকুন: মেঘ সবচেয়ে সুন্দর ভোরে, আর একই দিনে ফেরা ক্লান্তিকর। সাপ্তাহিক ছুটির জন্য আগে থেকে ঘর বুক করুন, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে গরম কাপড় নিন, আর বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক অনিয়মিত হতে পারে বলে পাওয়ার ব্যাংক ও নগদ টাকা রাখুন।
মেঘের জন্য বর্ষার শেষ থেকে শীতের শুরু, মোটামুটি আগস্ট থেকে নভেম্বর সেরা; পরিষ্কার আকাশের জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।
খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়ির জন্য আলাদা একটা দিন রাখুন। আলুটিলা গুহা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া অন্ধকার সুড়ঙ্গ, যেখানে মশালের আলোয় হাঁটতে হয়, ওপরে আছে ভিউপয়েন্ট। একটু সামনে রিছাং ঝরনা, যেখানে পানি লম্বা পাথুরে ঢাল বেয়ে নামে; অনেকে ঢাল বেয়ে পিছলে নামেন, কিন্তু পাথর শক্ত ও পিচ্ছিল, তাই দুবার ভাবুন।
বান্দরবান
বান্দরবান শহর থেকে জিপে উঠে যান নীলগিরি, পাহাড়চূড়ার ভিউপয়েন্ট, যেখানে প্রায়ই মেঘ ভাসে পায়ের নিচে। শহরের কাছে পাহাড়ের চূড়ায় সোনালি বুদ্ধ ধাতু জাদি। আরও গভীরে আছে বম গ্রামের পাশে গভীর, স্থির বগা লেক আর থানচি থেকে সাঙ্গু ধরে নৌকায় গিয়ে রেমাক্রি থেকে হেঁটে পৌঁছানো নাফাখুম ঝরনা। দুটোর জন্যই গাইড, অন্তত দুই দিন আর বর্তমান অনুমতি লাগে। কোনোটিতেই সাঁতার কাটবেন না।
সম্মান রেখে ভ্রমণ
পাহাড় নিজস্ব ভাষা, বিশ্বাস ও জীবনধারার মানুষের ঘর। কয়েকটি অভ্যাস বড় পার্থক্য গড়ে দেয়:
- বিশেষ করে গ্রামে আর প্রার্থনার সময় মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন
- গ্রামকে দর্শনীয় বস্তু নয়, মানুষের বাড়ি হিসেবে দেখুন; আমন্ত্রণ ছাড়া ঘরে বা জুমক্ষেতে ঢুকবেন না
- বিহারে শালীন পোশাক পরুন, বলা হলে জুতা খুলুন আর আস্তে কথা বলুন
- রাতে আওয়াজ কম রাখুন, সাজেকের শৈলশিরায় তো বটেই
- আবর্জনা সঙ্গে নিয়ে ফিরুন; পাহাড় থেকে বর্জ্য সরানো কঠিন
- হাতে বোনা কাপড় আর স্থানীয় খাবার সরাসরি জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছ থেকে কিনুন
চেখে দেখুন ব্যাম্বু চিকেন, বাঁশ কোড়লের তরকারি আর মৌসুমের পাহাড়ি ফল। এপ্রিলের মাঝামাঝি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো উদ্যাপন করে বৈসাবি (বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক ও বিষু); অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করলে এ সময়টা ঘোরার জন্য আনন্দের।
কখন যাবেন
অক্টোবর থেকে মার্চে দিন ঠান্ডা, শুকনো আর দৃশ্য পরিষ্কার। জুন থেকে সেপ্টেম্বরে ঝরনা সবচেয়ে ভরা থাকে, কিন্তু পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল আর নৌকাযাত্রা বেশি ঝুঁকির।
বাস বুক করুন
শুরু করুন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাস দিয়ে, অথবা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বাস সরাসরি খুঁজে নিন।
- #Chittagong Hill Tracts
- #Sajek
- #Bandarban
- #Rangamati
- #Khagrachhari