ঢাকা ভ্রমণ গাইড: দর্শনীয় স্থান, খাবার, থাকার জায়গা ও যাতায়াত
ঢাকা ভ্রমণের বাস্তবসম্মত গাইড: পুরান ঢাকার মোগল দুর্গ আর নদীঘাট, সংসদ ভবন ও হাতিরঝিল, নাজিরা বাজারের কাচ্চি বিরিয়ানি, কোন এলাকায় থাকবেন আর মেট্রো, রিকশা ও সিএনজিতে কীভাবে ঘুরবেন।
৪ মিনিটে পড়া যাবে

বাংলাদেশের বেশির ভাগ যাত্রা ঢাকা থেকেই শুরু হয়, ঢাকাতেই শেষ হয়। কিন্তু রাজধানীটা নিজেও কয়েক দিন ঘুরে দেখার মতো। এই ঢাকা ভ্রমণ গাইডে পুরান ঢাকার মোগল স্থাপনা থেকে আধুনিক সংসদ ভবন পর্যন্ত দর্শনীয় স্থান, কী খাবেন, কোন এলাকায় থাকবেন এবং ব্যস্ত এই শহরে কীভাবে চলাফেরা করবেন — সবই আছে। জেলার আরও তথ্যের জন্য দেখুন আমাদের ঢাকা গাইড।
ঢাকা ভ্রমণের সেরা সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ সবচেয়ে আরামদায়ক: শুকনো, মৃদু দিন আর ঠান্ডা সন্ধ্যা, পুরান ঢাকায় হেঁটে ঘোরার জন্য আদর্শ। এপ্রিল থেকে জুন গরম ও আর্দ্র, আর বর্ষায় ভারী বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে।
সম্ভব হলে শহরের বড় দিনগুলোর কোনো একটিতে আসুন:
- জানুয়ারির মাঝামাঝি পুরান ঢাকার ছাদে ছাদে ঘুড়ির উৎসব সাকরাইন
- ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে
- পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল), রমনার বটমূলে গান আর মঙ্গল শোভাযাত্রা
- রমজান, যখন চকবাজারের ইফতার বাজারে গলি ভরে যায়
ঢাকায় কীভাবে যাবেন
ঢাকা দেশের আন্তঃজেলা বাসের কেন্দ্র। প্রতিটি বিভাগ থেকে বাস এসে থামে শহরজুড়ে নানা টার্মিনাল ও কাউন্টারে, যেমন গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী। টিকিটে নামার জায়গাটি দেখে নিন, আর সম্ভব হলে যেখানে থাকবেন তার সবচেয়ে কাছেরটি বেছে নিন। বাসে আনুমানিক সময়:
- চট্টগ্রাম থেকে: প্রায় ৫–৭ ঘণ্টা
- সিলেট থেকে: প্রায় ৫–৭ ঘণ্টা
- রাজশাহী থেকে: প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা
- কক্সবাজার থেকে: প্রায় ৮–১০ ঘণ্টা, বেশির ভাগ বাস রাতে চলে
শহরে ঢোকার যানজটে এই সময় অনেকটা বেড়ে যেতে পারে, তাই হাতে সময় রাখুন। সব প্রধান রুটে ঢাকা যাওয়া-আসার বাস খুঁজুন। ট্রেন থামে কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে, আর প্রধান শহরগুলো থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট আছে।
ঢাকার দর্শনীয় স্থান
পুরান ঢাকা
পুরান ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক প্রাণকেন্দ্র, আর বেশির ভাগ পর্যটকের মনে থেকে যায় এই অংশটাই। গলিতে ভিড় জমার আগে, সকাল সকাল শুরু করুন।
- লালবাগ কেল্লা: ১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম এর নির্মাণ শুরু করেন, কাজ আর শেষ হয়নি। বাগান, মসজিদ আর পরী বিবির সমাধি মিলিয়ে এটিই শহরের সবচেয়ে পরিচিত মোগল স্থাপনা।
- আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, ১৮৭২ সালে নির্মাণ শেষ হয়; এখন জাদুঘর।
- সদরঘাট: শহরের প্রধান নদীবন্দর, এখান থেকে বহুতল লঞ্চ ছাড়ে বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের পথে। বুড়িগঙ্গায় অল্প সময়ের নৌকাভ্রমণে নদী থেকে শহরটা দেখা যায়।
- তারা মসজিদ: আরমানিটোলায়, বিশ শতকের গোড়ায় ভাঙা চীনামাটির টুকরোর (চিনি টিকরি) কারুকাজে মোড়ানো।
- আর্মেনিয়ান চার্চ: ১৭৮১ সালে যে বণিক সম্প্রদায় এটি গড়েছিল, তাদের নামেই আরমানিটোলা; তারা মসজিদের কাছেই, হেঁটে কয়েক মিনিট।
- ঢাকেশ্বরী মন্দির: জাতীয় মন্দির, "ঢাকার দেবী"; অনেকের বিশ্বাস, এই মন্দির থেকেই শহরের নাম।
মধ্য ও নতুন ঢাকা
- কার্জন হল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল ইটের প্রতীক, ১৯০৪ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত; ইউরোপীয় ও মোগল রীতির মিশেল।
- জাতীয় সংসদ ভবন: শেরেবাংলা নগরে লুই আই. কানের নকশা করা ভবন, বিশ শতকের সবচেয়ে প্রশংসিত স্থাপনাগুলোর একটি। চারপাশের সবুজ চত্বর আর জলাধার সন্ধ্যায় বেড়ানোর প্রিয় জায়গা।
- হাতিরঝিল: গুলশান, তেজগাঁও আর রামপুরার মাঝে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ লেক, পাড়ে হাঁটার পথ আর ছোট ওয়াটার বাস। সন্ধ্যার পর সেতুগুলোতে আলো জ্বললে সবচেয়ে সুন্দর।
ঢাকা থেকে দিনভর ভ্রমণ
- সোনারগাঁয়ের পানাম সিটি: শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উনিশ শতকের বণিকবাড়ির একটি সরু রাস্তা, কাছেই সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর। যানজটসহ এক দিকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ধরুন।
- গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান: শহরের উত্তরে শালবনে নিরিবিলি হাঁটা।
ঢাকায় কী খাবেন
ঢাকায় খাওয়াদাওয়া ভালো, আর পুরান ঢাকায় সবচেয়ে ভালো।
- কাচ্চি বিরিয়ানি: কাঁচা খাসির মাংস আর চাল স্তরে স্তরে সাজিয়ে মুখ বন্ধ হাঁড়িতে ধীরে রান্না, সঙ্গে বোরহানি। এর কেন্দ্র নাজিরা বাজার ও বংশাল, যেখানে হাজীর বিরিয়ানির মতো পুরোনো বিরিয়ানির দোকান আছে।
- বাকরখানি: পুরান ঢাকার মাটির চুলায় সেঁকা মুচমুচে, স্তরওয়ালা রুটি, চায়ের সঙ্গে খাওয়া হয়।
- মোরগ পোলাও: মুরগির সঙ্গে রান্না সুগন্ধি পোলাও, বিয়ে আর উৎসবের প্রিয় পদ।
- ফুচকা ও চটপটি: শহরের প্রিয় স্ট্রিট ফুড, টিএসসি আর ধানমন্ডি লেকের সন্ধ্যার দোকানে সবচেয়ে জমে।
- বোরহানি ও লাচ্ছি: বিরিয়ানির সঙ্গে মসলাদার দইয়ের পানীয়, আর পুরান ঢাকার মিষ্টির দোকানের মিষ্টি লাচ্ছি।
বসে খাওয়ার জন্য প্রায় সব ধরনের রান্নার সবচেয়ে বেশি বিকল্প ধানমন্ডি আর গুলশানে।
ঢাকায় কোথায় থাকবেন
কী করবেন সেই অনুযায়ী এলাকা বেছে নিন, কারণ শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে অনেক সময় লাগে।
- গুলশান ও বনানী: উঁচু মানের ও আন্তর্জাতিক হোটেল, দূতাবাস আর রেস্তোরাঁ; কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোর মধ্যে বিমানবন্দরের সবচেয়ে কাছে।
- ধানমন্ডি ও পান্থপথ: শহরের মাঝখানে মাঝারি মানের হোটেল, পুরান ঢাকা আর গুলশান দুদিকেই যাওয়া সহজ।
- মতিঝিল ও পল্টন: কমলাপুর স্টেশন আর অনেক বাস কাউন্টারের কাছে কম খরচের হোটেল, ভোরের যাত্রার আগে সুবিধাজনক।
- উত্তরা: বিমানবন্দর থেকে কয়েক মিনিট, মেট্রো লাইনের ওপরে।
ঢাকায় চলাফেরা
- মেট্রো রেল (এমআরটি লাইন-৬) উত্তরা থেকে মিরপুর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চলে। উত্তর-দক্ষিণে যাওয়ার সবচেয়ে দ্রুত উপায়; সংসদ ভবনের কাছের স্টেশন বিজয় সরণি ও আগারগাঁও, আর কার্জন হলের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন।
- রাইড-শেয়ারিং অ্যাপে শহরজুড়ে গাড়ি ও মোটরসাইকেল পাওয়া যায়।
- সিএনজি অটোরিকশা সব জায়গায়; ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নিন।
- পুরান ঢাকার সরু গলিতে ঢোকার উপায় রিকশা।
অফিস সময়ে যানজট প্রচণ্ড। সম্ভব হলে দিনের শুরুতে বের হোন; শুক্রবার সাধারণত রাস্তা ফাঁকা থাকে।
ঢাকা ভ্রমণের টিপস
- এক সকালেই রিকশায় পুরান ঢাকা ঘুরে নিন: লালবাগ কেল্লা, আরমানিটোলার স্থাপনাগুলো আর সদরঘাট কাছাকাছি।
- মসজিদ, মন্দির ও মাজারে শালীন পোশাক পরুন, আর মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
- যাওয়ার আগে খোলার দিন ও সময় স্থানীয়ভাবে জেনে নিন; জাদুঘর ও স্থাপনা কোনো কোনো দিন বন্ধ থাকতে পারে।
- রিকশার জন্য খুচরা টাকা রাখুন, আর ভিড়ে ফোন-মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন।
- বাস কাউন্টারে পৌঁছাতে যথেষ্ট সময় হাতে রাখুন: সন্ধ্যার যানজটে শহর পার হতে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
এবার পরের গন্তব্যের পালা: ঢাকা থেকে দেশের যেকোনো জায়গার বাস খুঁজুন, আর আরও দর্শনীয় স্থানের জন্য দেখুন পূর্ণাঙ্গ ঢাকা জেলা গাইড।
- #Dhaka
- #Old Dhaka
- #travel guide
- #places to visit
- #Bangladesh