নৌকায় সুন্দরবনের গভীরে: ম্যানগ্রোভের খাল, কাদায় পায়ের ছাপ আর নিঃশব্দ রাত

খুলনা বা মোংলা থেকে লাইসেন্সধারী ট্যুর বোটে সুন্দরবনের যাত্রা: চওড়া পশুর নদী, করমজলের হাঁটাপথ, জোয়ারে সরু খাল, কাদায় পায়ের ছাপ, সশস্ত্র বনরক্ষী আর রাতের বনের গভীর নীরবতা।

৪ মিনিটে পড়া যাবে

সুন্দরবন দেখার জায়গা নয়, ঢোকার জায়গা, ধীরে ধীরে, পানির পথে, আর এটা আপনার শোনার ধরন বদলে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ঘর, জোয়ার-ভাটার নদী আর খালের এক গোলকধাঁধা, যেখানে মাটি কখনো পুরো শক্ত নয়, পানি কখনো পুরো স্থির নয়।

নদীর পথে

ঢাকা থেকে বাসে খুলনা আসেন, পদ্মা সেতু হয়ে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা, অথবা সরাসরি মোংলা। কয়েক দিনের বেশির ভাগ ভ্রমণ খুলনা বা মোংলা থেকে লাইসেন্সধারী ট্যুর বোটে ছাড়ে; খাবার, গাইড আর অনুমতির ব্যবস্থা করে ট্যুর প্রতিষ্ঠান। বনে ঢুকতে বন বিভাগের অনুমতি আর ফি লাগে, আর নিয়ম বদলায়, তাই বুকিংয়ের সময় বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।

সকালে ঘাটে আপনার নৌকা অপেক্ষা করছে: কাঠ বা স্টিলের জলযান, বসার ডেক, নিচে কেবিন আর রান্নাঘর, যেখান থেকে এর মধ্যেই পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ আসছে। সবার জন্য লাইফ জ্যাকেট থাকার কথা; ছাড়ার আগে দেখে নিন। রেলিংয়ের পাশে বসে দেখেন শহর ধীরে সরে যাচ্ছে।

পশুর ধরে

নদী চওড়া আর বাদামি, শুরুতে ব্যস্ত। মোংলা বন্দরের কাছে নোঙর করা জাহাজ, পানিতে নিচু হয়ে চলা মালবাহী নৌকা, বাঁশের খুঁটিতে জাল টাঙিয়ে ছোট নৌকায় কাজ করছেন জেলেরা। তারপর ধীরে ধীরে পাড় বদলায়। খেত আর নারকেলবাগানের জায়গা নেয় নিচু, গাঢ় সবুজ গাছের দেয়াল, যাদের শিকড় নেমে গেছে কাদায়।

অনেক নৌকার প্রথম গন্তব্য পশুর নদীর ধারে করমজল, মোংলা থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক। কাদার ওপর খুঁটিতে দাঁড়ানো কাঠের হাঁটাপথ চলে গেছে ম্যানগ্রোভের ভেতরে। ধীরে হাঁটুন। বনের মেঝে ভরা শ্বাসমূলে, কাদা ফুঁড়ে ওঠা হাজার হাজার ছোট শলাকার মতো শিকড়। কাঁকড়া দৌড়ে গর্তে ঢোকে। ডাল থেকে বানর তাকিয়ে থাকে, আর ভাগ্য ভালো হলে গাছের ফাঁকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে একটা চিত্রা হরিণ। ওঠার জন্য আছে ওয়াচটাওয়ার, আর কুমির ও হরিণের প্রজননকেন্দ্র।

সরু খাল

তারপর নৌকা আরও গভীরে যায়, আর তখনই আসলে সুন্দরবন শুরু। সবকিছু নির্ভর করে জোয়ার-ভাটার ওপর: পানি দেখে গাইড নামা আর খালে ঢোকার সময় ঠিক করেন, তাই ভোরে আর অদ্ভুত সময়ে তৈরি থাকতে শিখে যান।

জোয়ারের সময় বড় নৌকা ছেড়ে ছোট দেশি নৌকায় উঠে বইঠা বেয়ে ঢোকেন সরু খালে। ইঞ্জিনের শব্দ নেই। পানি দুধ-চায়ের রঙের, আর দুই পাশ থেকে বন এত কাছে চলে আসে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। মাথার ওপর ডাল এক হয়ে যায়। মরা ডালে বসা মাছরাঙা টুপ করে পানিতে নামে। পাড়ে লাফিয়ে বেড়ায় মেনো মাছ। কোথাও একটা না-দেখা পাখি একই সুরে বারবার ডেকে চলে।

গাইড ফিসফিস করে কথা বলেন আর আঙুল তুলে দেখান: পানিতে নেমে যাচ্ছে একটা গুইসাপ, উড়ে যাচ্ছে একটা বক। গাইড নিরাপদ না বললে নৌকা থেকে নামবেন না, হাত ভেতরে রাখুন। এই পানিতে লোনাপানির কুমির থাকে।

কাদায় পায়ের ছাপ

ভাটায় বন অন্য চেহারা দেখায়। পানি নেমে গিয়ে রেখে যায় চকচকে কাদার চওড়া পাড়, আর সেই কাদায় লেখা থাকে কে কে গেছে। হরিণের খুর। কুমিরের লেজের লম্বা দাগ। কাঁকড়ার রেখা। আর মাঝে মাঝে গাইড ঝুঁকে দেখান চার আঙুলের গোল একটা ছাপ: বাঘের পায়ের ছাপ।

বাঘ দেখা বিরল, দেখার আশা নিয়ে আসবেন না। কিন্তু ছাপগুলো, গাইডের নিচু গলা আর হরিণের হঠাৎ থেমে কান খাড়া করা মনে করিয়ে দেয়, বনটা কার।

বনরক্ষী

লম্বা ভ্রমণে আপনার দল চলে সশস্ত্র বনরক্ষীদের সঙ্গে। কোনো বন অফিসে নামলে বা পথে হাঁটলে একজন সামনে, একজন পেছনে, কাঁধে রাইফেল, চোখ ঝোপের দিকে। নিয়ম সহজ আর কঠোর: পথ ছেড়ে কোথাও যাবেন না, দল ছাড়বেন না, গাইড আর রক্ষীর কথা মেনে চলুন। বাঘ আর কুমির সত্যি, পাতার নিচে সাপও।

দেখবেন মৌসুমে অনুমতি নিয়ে বনে কাজ করা মানুষদেরও: মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল, কাঠ আর গোলপাতা সংগ্রহকারী বাওয়াল, আর জেলে। অনেকে বনে ঢোকার আগে প্রার্থনা করেন বনবিবির কাছে, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই শ্রদ্ধার বনের রক্ষাকর্ত্রী, যাঁর ছোট ছোট থান বনের ধার ঘেঁষে।

রাতের নীরবতা

আলো ফুরালে নৌকা পাড় থেকে দূরে চওড়া কোনো খালে নোঙর ফেলে। রান্নাঘর থেকে আসে রাতের খাবার: ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, হয়তো কাঁকড়া বা চিংড়ি। তারপর জেনারেটর বন্ধ হয়, নামে নীরবতা।

পুরো নিঃশব্দ নয় অবশ্য। খোলে পানির ছলাৎ। পোকার গুঞ্জন। দূরে কোথাও একটা হরিণ তীক্ষ্ণ সতর্কডাক দেয়, আর ডেকের সবার মাথা ঘুরে যায়। পাড় ধরে ভেসে বেড়ায় জোনাকি, ধীর স্ফুলিঙ্গের মতো। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তারা নেমে আসে গাছের মাথা পর্যন্ত। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বসে থাকেন, কথা প্রায় বলেন না। এটা সেই হাতে গোনা জায়গাগুলোর একটি, যেখানে রাতটা আপনার চেয়ে বড় মনে হয়।

সকালে পানির ওপর কুয়াশা, পাখিরা একসঙ্গে ডেকে ওঠে, আর নৌকা ঘরের পথ ধরে।

এই ভ্রমণের পরিকল্পনা

  • সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, ঠান্ডা-শুকনো আবহাওয়া আর শান্ত নদীর জন্য। নৌভ্রমণে ঘূর্ণিঝড়ের মাস মে আর অক্টোবর–নভেম্বর এড়িয়ে চলুন, ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে ভ্রমণ পিছিয়ে দিন।
  • বাসে: ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা, খুলনা থেকে মোংলা প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। ঢাকা থেকে সরাসরি মোংলাতেও বাস যায়। বাস খুঁজুন।
  • অনুমতি ও ট্যুর প্রতিষ্ঠান: লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান আর নিবন্ধিত গাইডের সঙ্গে যান; অনুমতি আর ফি লাগে, তাই বর্তমান নিয়ম জেনে নিন।
  • নিরাপত্তা: ছোট নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরুন, দল আর রক্ষীদের সঙ্গে থাকুন, সঙ্গে রাখুন পানি, মশা তাড়ানোর ক্রিম, টুপি আর টর্চ।
  • আরও দেখুন: খুলনা জেলা গাইড, ষাট গম্বুজ মসজিদসহ বাগেরহাট জেলা গাইড, খান জাহান আলীর মাজার, আর বনের শান্ত পশ্চিম অংশের জন্য মুন্সীগঞ্জ হয়ে সুন্দরবন। যাওয়ার আগে পড়ুন আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ গাইড।
  • #Sundarbans
  • #Mongla
  • #Khulna
  • #mangrove forest
  • #travel story

ব্লগ