উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ গাইড: তেঁতুলিয়া, কান্তজিউ মন্দির, তিস্তা ব্যারেজ, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুর

উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের বাস্তব গাইড: তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, পোড়ামাটির কান্তজিউ মন্দির, রংপুর বিভাগের তিস্তা ব্যারেজ ও তাজহাট জমিদারবাড়ি, সঙ্গে পথে মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুর, বাসের সময় আর এক ভ্রমণে সব দেখার পথ।

৪ মিনিটে পড়া যাবে

উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের শান্ত, খোলামেলা দিক: দিগন্ত পর্যন্ত ধানক্ষেত, হিমালয় থেকে নেমে আসা চওড়া নদী, সমতলের চা-বাগান আর দেশের সেরা কিছু ঐতিহ্য। এই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণ গাইডে আছে রংপুর বিভাগের সেরা জায়গাগুলো আর পথের দুই প্রাচীন নিদর্শন মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুর, যাতে এক ভ্রমণেই সব মিলিয়ে নিতে পারেন।

বাসে উত্তরবঙ্গ

উত্তরের প্রতিটি পথ পার হয় যমুনা সেতু। ঢাকা থেকে বাসে সাধারণ সময়, বেশির ভাগ রুটে দিন ও রাতের বাস:

  • বগুড়া: প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা
  • রংপুর: প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা
  • দিনাজপুর: প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা, বেশির ভাগ রাতের বাস
  • নীলফামারী ও সৈয়দপুর: প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা
  • পঞ্চগড়: প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, বেশির ভাগ রাতের; কিছু বাস তেঁতুলিয়া পর্যন্ত যায়

সেতুর কাছে যানজটে বাড়তি সময় লাগতে পারে, ঈদের আগে আরও অনেক বেশি। একদিক বিমানে যেতে চাইলে নীলফামারীর সৈয়দপুরে অঞ্চলের বিমানবন্দর আছে।

বগুড়া ও মহাস্থানগড়

উত্তরের প্রবেশদ্বার বগুড়া, প্রথম যাত্রাবিরতির স্বাভাবিক জায়গা। শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে মহাস্থানগড়, প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের স্থান এবং বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর-নিদর্শনগুলোর একটি। দুর্গনগরের ইটের প্রাচীর আজও মাঠের ওপর মাথা তুলে আছে, আর এখানে পাওয়া মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি দেশের প্রাচীনতম লিখিত দলিলগুলোর একটি। দুর্গের ওপর শাহ সুলতান বলখি মাহিসাওয়ারের মাজার, কাছেই একটি জাদুঘর।

কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল মেধ, ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া ইটের ঢিবি, যা সবার কাছে বেহুলার বাসরঘর নামে পরিচিত। দিন শেষ করুন শহরে ফিরে বগুড়ার বিখ্যাত দই দিয়ে।

পাহাড়পুর

নওগাঁর পাহাড়পুরে আছে সোমপুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ, অষ্টম শতকের শেষ দিকে পাল রাজা ধর্মপাল যা নির্মাণ করেন; একসময় এটি হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহারগুলোর একটি ছিল। ভিক্ষুদের কক্ষের সারি দিয়ে ঘেরা চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণের মাঝে ক্রুশাকৃতির উঁচু মন্দির, যার দেয়ালে শত শত পোড়ামাটির ফলক। এটি ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য।

পাহাড়পুর যেতে হয় নওগাঁ বা জয়পুরহাট হয়ে; বগুড়া থেকে বাসে নওগাঁ প্রায় দেড় ঘণ্টা, শেষ অংশ স্থানীয় অটোরিকশায়। জায়গাটি বড় ও খোলা, তাই সকালে পানি আর টুপি নিয়ে যান, আর দেয়ালে উঠবেন না।

রংপুর

রংপুর শহরের প্রান্তে তাজহাট জমিদারবাড়ি, বিশ শতকের শুরুর জমিদার প্রাসাদ, চওড়া মার্বেলের সিঁড়ি আর মাঝখানে গম্বুজ; এখন এখানে রংপুর জাদুঘর। কাছেই ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গম্বুজওয়ালা কারমাইকেল কলেজ, উত্তরের সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাসগুলোর একটি। জুন-জুলাইয়ে রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম খুঁজে দেখুন। যাওয়ার আগে জাদুঘর খোলার দিন জেনে নিন।

দিনাজপুর ও কান্তজিউ মন্দির

রংপুর থেকে বাসে দিনাজপুর প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। মূল আকর্ষণ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে কান্তনগরের কান্তজিউ মন্দির: ১৭৫২ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া আঠারো শতকের কৃষ্ণমন্দির, যার দেয়াল ভিত থেকে ছাদ পর্যন্ত রামায়ণ, মহাভারত আর পুরোনো বাংলার দৈনন্দিন জীবনের পোড়ামাটির ফলকে ঢাকা। বাংলাদেশে এর তুলনা নেই। এটি জীবন্ত মন্দির, তাই শালীন পোশাক পরুন আর পোড়ামাটির কাজ ছোঁবেন না।

একই ভ্রমণে কাছের ছোট্ট পোড়ামাটির নয়াবাদ মসজিদ আর দিনাজপুর শহরের ঠিক দক্ষিণে ছায়াঘেরা জাতীয় উদ্যানের মাঝে আঠারো শতকের বিশাল দিঘি রামসাগর দেখে নিন। চেখে দেখুন জেলার কাটারিভোগ চাল ও চিড়া, আর মে মাসের শেষ থেকে জুনে লিচু।

তিস্তা ব্যারেজ

নীলফামারী শহর থেকে ডিমলা হয়ে উত্তরে সড়কপথে প্রায় দেড় ঘণ্টা দূরে ডালিয়ায় নদীর ওপর তিস্তা ব্যারেজ। এটি সবার আগে একটি দৃশ্য: বর্ষায় চওড়া জলস্রোতের ওপর দিয়ে গেটের লম্বা সারি, শীতে নদী ভাগ হয়ে যায় অনেক ধারা আর বালুচরে। দর্শনার্থীরা কোথায় হাঁটতে পারবেন, দায়িত্বরত কর্মীদের নির্দেশ মেনে চলুন, আর ব্যারেজের নিচে কখনো সাঁতার কাটবেন না বা পানিতে নামবেন না।

তেঁতুলিয়া ও কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য

দেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়, আর পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে, বাসে বা সিএনজিতে প্রায় এক ঘণ্টায়, মহানন্দা নদীর তীরে তেঁতুলিয়া। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরে কুয়াশা কেটে গেলে ভোরে উত্তরের দিগন্তে দেখা দিতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়া। দৃশ্যটি কখনো নিশ্চিত নয়, তাই রাতে থাকুন, সূর্যোদয়ের আগে নদীর পাড়ের ভিউপয়েন্টে পৌঁছান, আর সম্ভব হলে দুই-তিনটি সকাল হাতে রাখুন।

এখানে মহানন্দাই আন্তর্জাতিক সীমান্ত: চিহ্নিত এলাকার মধ্যে থাকুন আর সীমান্তরক্ষীদের নির্দেশ মেনে চলুন। আরও প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরে দেশের উত্তরতম বিন্দু বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। তেঁতুলিয়ার আশপাশে সমতল জমিতে চা-বাগান, এমন দৃশ্য দেশের আর কোথাও নেই; বাগানগুলো ব্যক্তিমালিকানার, তাই ভেতরে ঢোকার আগে অনুমতি নিন।

এক ভ্রমণে সব

প্রায় এক সপ্তাহের আরামদায়ক একটি পথ:

১. রাতের বাসে বগুড়া। মহাস্থানগড় ও গোকুল মেধ; রাতে বগুড়ায়। ২. নওগাঁ বা জয়পুরহাট হয়ে পাহাড়পুর; তারপর উত্তরে। ৩. রংপুর: তাজহাট জমিদারবাড়ি ও কারমাইকেল কলেজ। ৪. দিনাজপুর: কান্তজিউ মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ ও রামসাগর। ৫. পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া: ভোরের দৃশ্যের জন্য রাতে থাকা, আর বাংলাবান্ধা। ৬. ফেরার পথে নীলফামারী হয়ে তিস্তা ব্যারেজ, তারপর রংপুর বা সৈয়দপুর থেকে রাতের বাসে ঢাকা।

শহরগুলোর মধ্যে সড়কপথের সময় বদলায়, তাই প্রতিদিন সকালে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।

কখন যাবেন

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি শুকনো ও মনোরম, ঘোরার জন্য ভালো; কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সবচেয়ে ভালো সুযোগ অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে একদম উত্তরে প্রচণ্ড ঠান্ডা আর প্রায়ই ঘন কুয়াশা, তাই গরম কাপড় নিন।

বাস বুক করুন

বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী বা পঞ্চগড়ের বাস খুঁজুন, ছাড়ার সময় মিলিয়ে অনলাইনে সিট বেছে নিন।

  • #North Bengal
  • #Rangpur
  • #Tetulia
  • #Kantajew Temple
  • #Mahasthangarh
  • #Paharpur

ব্লগ