অঞ্চলভেদে বাংলাদেশের খাবার: কোন জেলার কোন খাবার বিখ্যাত
পুরান ঢাকার কাচ্চি, চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস, সিলেটের সাতকরা, বগুড়ার দই আর কুমিল্লার রসমালাই: অঞ্চল ধরে ধরে বাংলাদেশের বিখ্যাত খাবারের গাইড, কোথায় পাবেন তাসহ।
৪ মিনিটে পড়া যাবে

বাংলাদেশে কাউকে জিজ্ঞেস করুন তাঁর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত, উত্তরে প্রায়ই আসবে কোনো খাবারের নাম। প্রায় প্রতিটি শহরেরই গর্ব করার মতো একটা পদ বা মিষ্টি আছে, আর অনেক ভ্রমণকারীর কাছে সেখানে গিয়ে সেটা খাওয়াই ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ। কোন জেলার কোন খাবার বিখ্যাত, এই গাইডে তা অঞ্চল ধরে ধরে সাজানো হলো, প্রতিটি জায়গার ডিসকভার গাইডের লিংকসহ — কোথায় খাবেন আর কী দেখবেন তা সেখানে পাবেন।
ঢাকা
পুরান ঢাকা: কাচ্চি, বাকরখানি আর মোরগ পোলাও
পুরান ঢাকা ভারী খাবারের রাজধানী। কাঁচা মাংস আর চাল স্তরে স্তরে সাজিয়ে মুখবন্ধ হাঁড়িতে ধীরে রান্না কাচ্চি বিরিয়ানি এর সবচেয়ে পরিচিত খাবার, সঙ্গে মসলাদার দইয়ের বোরহানি। মাটির তন্দুরে সেঁকা মচমচে স্তরের রুটি বাকরখানি খাওয়া হয় চায়ের সঙ্গে, আর মোরগ পোলাও বিয়েবাড়ির প্রিয়। রমজানে চকবাজারের ইফতার বাজার শহরের সবচেয়ে পুরোনো খাবারের ঐতিহ্যগুলোর একটি। খাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে নিন লালবাগ কেল্লা বা আহসান মঞ্জিল।
ঢাকার আশপাশে
- মাওয়ার ইলিশ ভাজা। মাওয়ায় নদীর ধারে গরম ভাতের সঙ্গে মচমচে করে ভাজা পদ্মার তাজা ইলিশ।
- পোড়াবাড়ির চমচম। ঘন, লালচে-বাদামি ছানার মিষ্টি, টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার।
- হাজারি গুড়। শীতে তৈরি মানিকগঞ্জের হালকা, সুগন্ধি খেজুরের গুড়। নকল প্রচুর, তাই বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কিনুন।
চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্ব
মেজবানি মাংস আর কালা ভুনা
চট্টগ্রামের সবচেয়ে গর্বের খাবার মেজবানি মাংস, মেজবানের মতো গাঢ় মসলায় ধীরে রান্না গরুর মাংস; মেজবান হলো সবাইকে খাওয়ানোর ভোজ। মসলায় ধীরে ভাজতে ভাজতে প্রায় কালো হয়ে আসা কালা ভুনা পরোটার সঙ্গে দারুণ। চেখে দেখুন শুঁটকি, আর চায়ে ডুবিয়ে খান শক্ত বেলা বিস্কুট।
কক্সবাজার ও পাহাড়
কক্সবাজারের সৈকতে সাজানো তাজা মাছ থেকে বেছে ভাজিয়ে নিন; রূপচাঁদা ভাজা সেখানকার চিরচেনা পদ। রান্নার আগে ওজনের হিসাবে দাম জেনে নিন। রাঙামাটি আর বান্দরবানের পাহাড়ে খেয়ে দেখুন ব্যাম্বু চিকেন, কাঁচা বাঁশের চোঙে ভরে আগুনে রান্না মুরগি।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও ফেনী
- কুমিল্লার রসমালাই। দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত রসমালাই কুমিল্লার। অনেক দোকানের নাম প্রায় একই রকম, তাই ঠিকানা মিলিয়ে নিন।
- ছানামুখী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিনির আবরণে মোড়া ছোট ছোট শক্ত ছানার টুকরো; অনেক দিন ভালো থাকে, বাড়ি নেওয়ার জন্য উপযুক্ত।
- চাঁদপুরের ইলিশ। “ইলিশের বাড়ি” চাঁদপুরে ইলিশ মেলে ভাজা, সরষে ইলিশ বা কলাপাতায় পাতুরি হয়ে, বর্ষা আর শরতে সবচেয়ে তাজা।
- মহিষের দই। ফেনী ও নোয়াখালীর ঘন, হালকা টক দই, প্রায়ই মাটির পাত্রে বিক্রি হয়।
সিলেট
সাতকরার মাংস, আখনি আর সাত রঙের চা
সিলেটে গরুর মাংস রান্না হয় সাতকরা দিয়ে, টক-তেতো এক স্থানীয় লেবু যার খোসা তরকারিতে আনে আলাদা ঘ্রাণ; প্রায় শুধু এখানেই মেলে। আখনি মাংস দিয়ে রান্না মসলাদার ভাত, বিরিয়ানির চেয়ে হালকা। শ্রীমঙ্গলে চেখে দেখুন রঙের স্তরে ঢালা সাত রঙের চা, আর বাগানের তাজা সাধারণ চা-ও। শীতে খুঁজে নিন বাঁশের চোঙে রান্না বিন্নি চালের চুঙ্গা পিঠা।
রাজশাহী ও উত্তর-পশ্চিম
রাজশাহী: আম আর কালাই রুটি
রাজশাহী আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের দেশ: মে থেকে জুলাই ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া আর গোপালভোগ। শীতের সন্ধ্যায় খান কালাই রুটি, মাষকলাই আর চালের আটার মোটা রুটি, গরম গরম মরিচ-পেঁয়াজের ভর্তা বা গরুর মাংসের সঙ্গে।
নাটোর, বগুড়া আর উত্তরের মিষ্টি
- কাঁচাগোল্লা। নাটোরের তাজা ছানার নরম মিষ্টি, সারা দেশে পরিচিত।
- বগুড়ার দই। মাটির পাত্রে জমানো ঘন, মিষ্টি, ক্যারামেল রঙের দই, যার জন্য বগুড়া বিখ্যাত। মহাস্থানগড়ের বাজার থেকে কিনে নিন মচমচে কটকটি।
- পাবনার ঘি। পাবনা পরিচিত ঘি, দই আর দুধের মিষ্টির জন্য।
খুলনা ও দক্ষিণ-পশ্চিম
চুইঝাল আর চিংড়ি
খুলনা আর বাগেরহাটে খাসি, গরু বা হাঁসের মাংস রান্না হয় চুই দিয়ে, এক স্থানীয় লতার ঝাঁঝালো কাণ্ড, যার ঝাল মুখে অনেকক্ষণ থাকে; চুকনগরের পথের ধারের হোটেলগুলো এর জন্য বিখ্যাত। গলদা ও বাগদা চিংড়ি মেলে নারকেলের দুধে মালাইকারি হয়ে।
খেজুর গুড় আর কুষ্টিয়ার তিলের খাজা
শীতে যশোরে খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় খেজুর গুড় আর পাটালি, আর সবখানে শীতের পিঠা। কুষ্টিয়া পরিচিত তিলের খাজার জন্য, তিল আর চিনির মচমচে-চিবানো কাঠি।
বরিশাল ও দক্ষিণ
বরিশাল আর আশপাশের জেলা পেয়ারা, আমড়া আর নদীর ইলিশের দেশ। জুলাই-আগস্টে ভীমরুলির ভাসমান বাজারে নৌকা থেকেই পেয়ারা কিনুন।
ময়মনসিংহ ও উত্তর
- মুক্তাগাছার মণ্ডা। ছানা আর চিনির চ্যাপ্টা, হালকা বাদামি মিষ্টি, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে মুক্তাগাছায় তৈরি হচ্ছে। দেখুন ময়মনসিংহের গাইড।
- বালিশ মিষ্টি। নেত্রকোনার বালিশের মতো বড় ছানার মিষ্টি, ওপরে ঘন দুধের প্রলেপ।
রংপুর ও দিনাজপুর
- কাটারিভোগ চাল আর লিচু। দিনাজপুরের সরু, সুগন্ধি চাল, আর মে মাসের শেষ থেকে জুন পর্যন্ত লিচু।
- সিদল ভর্তা আর হাঁড়িভাঙা আম। রংপুরের মরিচ-রসুনে মাখা গাঁজানো মাছের ভর্তা, আর জুন-জুলাইয়ে আঁশহীন নিজস্ব আম।
- রসমঞ্জরী। গাইবান্ধার ঘন জ্বাল দেওয়া দুধে ডোবানো ছোট ছোট ছানার বল।
ভোজনরসিক যাত্রীদের জন্য পরামর্শ
- মিষ্টি কিনুন টাটকা, নামকরা দোকান থেকে, আর ঠিকানা মিলিয়ে নিন: বিখ্যাত নাম প্রায়ই নকল হয়।
- দইয়ের মাটির পাত্র সোজা রাখুন, হাতের ব্যাগে রাখুন, বাসের লাগেজ বক্সে নয়। ছানামুখী আর তিলের খাজার মতো শুকনো মিষ্টি পথে সবচেয়ে ভালো থাকে।
- মৌসুম মাথায় রাখুন। আম আর লিচু গ্রীষ্মের ফল, ইলিশ সবচেয়ে ভালো বর্ষায়, আর গুড়-পিঠা শীতের। পরিকল্পনায় কাজে লাগবে বাংলাদেশ ভ্রমণের সেরা সময়।
- লম্বা যাত্রার আগে হালকা খান, ভোজটা রাখুন পৌঁছানোর পরের জন্য।
খিদে পেয়ে গেল? যে জেলার স্বাদ নিতে চান সেখানে যেতে বাস খুঁজুন, আর আরও স্থানীয় খাবারের খোঁজে দেখুন সব জেলার গাইড।
- #Bangladeshi food
- #regional food
- #sweets
- #food guide
- #Bangladesh